ব্যাটল অফ স্টালিনগ্রাদ

“ব্যাটল অফ স্টালিনগ্রাদ”

৯ই মে ছিল রাশিয়ার স্বাধীনতা দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে হিটলারের নৎসী বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়ন এর নিকট আর্তসমার্পন করে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ২৩ আগস্ট, ১৯৩৯ সনে
নাজি জার্মানির সাথে একটি নন-অগ্রেশন  চুক্তির স্বাক্ষর করে। এই চুক্তিটিতে একটি গোপন প্রোটোকল অন্তর্ভুক্ত ছিল যার অংশ হিসেবে (রোমানিয়া, পোল্যান্ড, লিথুনিয়া, লাতভিয়া, এস্তোনিয়া, বেলারুশ, ইউক্রেন, এবং ফিনল্যান্ড) অঞ্চলগুলো জার্মান ও সোভিয়েত প্রভাবের বলয়ে  এই দেশগুলোর সম্ভাব্য “আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক পুনর্গঠন” প্রত্যাশা করে।

(১৯৩৯ সালে জার্মান ও সোভিয়েত ইউনিয়ের মধ্যকার “নন-এগ্রেশন” চুক্তি অনুযায়ী ইউরোপ)

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে  জার্মান মিত্রবাহিনীর নিকট একে একে  ইউরোপের সব দেশগুলো আত্মসমার্পন করেছিল।  হিটলারের সাথে তখনো সোভিয়েত ইউনিয়ন কোন প্রকার সংঘর্ষে জড়ায় নি।

কিন্তু “ব্যাটল ওফ ব্রিটেন” এ জার্মান নৎসী বাহিনীর অপূরনীয় ক্ষতি হয়ে গেলে তারা তাদের মনযোগ সোভিয়েত  ইউনিয়নের দিকে মনোস্থির করে।
পশ্চিমে জার্মান বাহিনীর একের পর এক সাফল্য তাদের পূর্বদিকের সোভিয়েত ইউনিয়ন দখলে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

(তীর চিহ্নে নির্দেশিত তেল সমৃদ্ধ ককেশাস অঞ্চল এবং জার্মান পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভবিষ্যত জার্মান মানচিত্র)

১৯৩৯ সালে জার্মানি-সোভিয়েত নিজেদের মধ্যে সম্পাদিত নন-আগ্রশন চুক্তি  সত্ত্বেও হিটলার ২ বছর পর ১৯৪১ সালের ২২ জুন সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমন করে বসে!

হিটলারের লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের তেল সমৃদ্ধ ককেশাস  অঞ্চল দখল করে তার বিশাল বাহিনীর তেলের যোগান নিশ্চিত করা এবং ভৌগলিকগত সুবিধাজনক স্থানে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা।

কিন্তু এটি ছিল হিটলারের সব চেয়ে বড় ভুল।
এই অপারেশন এর নাম ছিল “অপারেশন বার্বারোসা”!
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমে তারা পোলান্ড আক্রমন করে।

(অপারেশন বারবারোসায় জার্মান বাহিনীর অধিকৃত পূর্ব ইউরোপ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এর অংশ)

তারপর একে একে  সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশগুলো দখল করে পূর্বের দিকে জার্মান মিত্রবাহিনী মস্কোর দিকে স্থলযুদ্ধে অগ্রসর হয়।
ছোট বড় অনেকগুলো যুদ্ধ সংঘঠিত হয় তার মধ্যে অন্যতম ছিল “স্টালিনগ্রাদ” এর যুদ্ধ

“স্টালিনগ্রাদ”

ককেশাস অঞ্চল দখল করার ক্ষেত্রে সব চেয়ে বড় বাধা ছিল “ভলগা” নদ। এই নদীর ধারে একটি শহর ছিল “স্টালিনগ্রাদ” যেখানে সোভিয়েত রেড আর্মি নিজেদের সবটুকু দিয়ে  শহরকে রক্ষা করে রেখেছিল।

কিন্তু ১৯৪২ সালের অগাস্টে নৎসী বাহিনী স্টালিনগ্রাদ আক্রমন করে।  তীব্র আক্রমনের মুখে তিন মাসে তার ৯০% নিজেদের দখলে নেয়।

(জার্মান নৎসী বাহিনী ও সোভিয়েত রেড আর্মির অবস্থান। অক্টোবর ১৯৪২ সন)

 

(জার্মান নৎসী বাহিনী ও সোভিয়েত রেড আর্মির অবস্থান। নভেম্বর ১৯৪২)

মজার ব্যাপার হল সোভিয়েত রেড আর্মি তা পালটা দখলে সরাসরি আক্রমন না করে প্রথমে যে সকল ট্রুপ্স “স্টালিনগ্রাদ” এর নৎসী বাহিনীদের খাদ্য, গোলাবারুদ সহ সব প্রকার রসদ পরিবহণ করে আসছিল সেই রসদ ব্যবস্থা ধ্বংস করে পুরো শহর ঘিরে ফেলে।

(জার্মান বাহিনীকে ঘিরে ফেলেছে রেড আর্মি)

নৎসী বাহিনী এবং সোভিয়েত রেড আর্মি পরস্পর মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এদিকে শীতের মৈসুম চলে আসলে জার্মান বাহিনী খাদ্যের অভাব আর শীতের প্রকোপে নাজেহাল হয়ে যায়। জার্মান বাহিনী খাদ্যের অভাব, তীব্রশীতের ফলে ফ্রসবাইট এর ফলে মৃত্যু বরন করতে থাকে। এই অবস্থায় অনেক জার্মান সৈন্য আত্মহত্যা করে।

(জার্মান সৈনদের কোনঠাসা অবস্থান! সময়: জানুয়ারি ১৯৪৩ সন)

 

নিশ্চিত পরাজয় জেনেও এর পরও হিটলার আত্মসমার্পন করতে চায় নি।
তার নির্দেশ  ছিল শেষ সৈন্যটি বেচে থাকা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়া।
অবশেষে ১৯৪৩ সনের ফেব্রুয়ারিতে জার্মান বাহিনীর খাদ্য-অস্ত্র সহ সকল মজুদ শেষ হয়ে যায় এবং সোভিয়েত রেড আর্মির নিকট সোচনীয় পরাজয় গ্রহন করে।

স্টানিলগ্রাদে থাকা একেকটি বিল্ডিং ছিল একেকটি দূর্গ যেখানে সোভিয়েত সৈন্যরা অবস্থান করে জার্মানিদের বিপক্ষে লড়াই চালিয়ে যায়। সোভিয়েত রেড আর্মির বীরত্ব ও সাহসে জার্মান বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।

৯০ হাজার জার্মান সৈন্যকে কারাবরণ করতে হয় যাদের অর্ধেকই সোভিয়েত প্রিজন ক্যাম্পে মৃত্যুবরন করে।

৫ মাসের এই যুদ্ধে উভয়পক্ষেরই  ব্যপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। এই যুদ্ধে জার্মান মিত্রবাহিনীর ৯০০ যুদ্ধ বিমান, ১৫০০ ট্যাংকার ধ্বংস হয় & ৭৪৪টি যুদ্ধ বিমান, ১৬৬৬টী ট্যাংক আটক করা হয়।
৬৪৭,৩০০ – ৭৬৮,৩৭৪ জনের মত জার্মান মিত্রবাহিনীর সৈন্য প্রান হারায় & আহত হয়!

অপর দিকে সোভিয়েত অংশে ক্ষয় ক্ষতির পরিমান ছিল আরো বেশি!
প্রায় ৫ লাখের মত নিহত হয়, সাড়ে ৬ লাখের মত মানুষ পঙ্গুত্ব বরন করে।
২৭৬৯টি যুদ্ধবিমান, ৪৩৪১টি ট্যাংক ধ্বংস হয়..

“স্টালিনগ্রাদ” এর যুদ্ধকে বলা হয়ে থাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট। এই যুদ্ধ ছিল জার্মানির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরাজয়।
এ যুদ্ধের পর জার্মান নৎসী বাহিনী পূর্বদিকে আর  কোন যুদ্ধেই আর জয় লাভ করতে পারেনি.. অপরদিকে সোভিয়েত রেড  আর্মি পশ্চিম দিকে আগ্রসর হতে থাকে। একে একে তাদের দখল করা অংশ সোভিয়েত রেড আর্মির কাছে হারাতে হয়।

(সোভিয়েত রেড আর্মির নিকট জার্মান সম্রাজ্যের পরাজয়ের মানচিত্র)

জার্মানির বিশাল সৈন্যবাহিনী থাকা সত্বেও তাদের “অপারেশন বার্বারোসা” মিশন ব্যর্থ হওয়ার পিছে রাশিয়ার প্রতিকূল শীতল আবহাওয়াকে দায়ী করা হয়।

অবশেষে ১৯৪৫ সালের ৯ই মে বার্লিনে নৎসী বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়ন এর নিকট আত্মসমার্পন করে।

স্টালিনগ্রাদের যুদ্ধের উপর অনেকগুলো সিনেমা নির্মিত হয়েছে। চাইলেই দেখে আসতে পারেন, এতে ইতিহাসের মাধ্যমে যুদ্ধ ও ভালোবাসা প্রতিফলিত হয়েছে।

সূত্র: উইকিপিডিয়া & ইউটিউব