মার্চ ১৬১২।

মস্কো ক্রেমলিন দখল করে বসে আছে পোলিশ সৈন্য বাহিনী। পুরো রাশিয়া এখন পোলিশদের হাতে। সময়ের সেরা সুদক্ষ  সুইডিশ সেনাবাহিনীর সহায়তা নিয়েও  পার পায় নি রুশরা। একে একে সব ব্যাটাকে ঠেঙ্গিয়ে বিদেয় করেছে পোলিশ রাজ তৃতীয় সিগিস্মুন্ডের আগ্রাসী সৈন্যদল। Smolensk দখল করার পর ই অবশ্য নরম হয়ে গিয়েছিল ক্রেমলিন রাজসভার গলার স্বর। সিগিস্মুন্ডের ছেলে ভ্লাদিস্লাভকেই রাশিয়ার হবু জার হিসেবে মেনে নিয়েছে রাজসভা। কিন্তু তাতেও মন গলে নি সিগিস্মুন্ডের। কারন তিনি জানেন শুধু কথায় চিড়ে ভিজবে না। সিন্দুকের চাবি কোমরে না থাকলে ঘরের ঝি ও কথা শোনে না। তাই  Smolensk থেকে দ্রুত বাহিনী পাঠিয়ে মস্কো দখল করে নিলেন। যেই ইভানকে (Ivan the terrible) লিথুনিয়ার সাথে জোট বানিয়েও পরাজিত করা যায় নি, আজকে তার ই সিংহাসনে নিজের ছেলের মাথায় তার রেখে যাওয়া মুকুট তুলে দেওয়া হবে। পোলিশদের সব চেয়ে বড় সুখের দিন আজ।  পোলিশ ইতিহাস এইদিনের কথা স্বরণ করে হাজার বছর পর ও তার নামে জয়ধ্বনি তুলবে। তাকে নিয়ে জয়গান রচিত হবে। এসব ভাবতে ভাবতে আনন্দের অস্থিরতায়  ক্রমাগত নিজের খানদানী গোঁফে তা দিচ্ছিলেন পোলিশ রাজ।

 

পোলিশদের আঙিনায় যখন পৌষের হাওয়া, রুশরা তখন সর্বনাশের সপ্তমে। ঝামেলাটা শুরু করেছিল ইভান নিজেই। নিজের পাগলামিতে নিজের বড় ছেলেকে নিজেই খুন করে বসে। যে আবার কিনা ছিল ভবিষ্যৎ জার। সেই পাগলামিতে শুধু নিজের ছেলেকেই হত্যা করে নি, হত্যা করেছিল ৮০০ এর অধিক বছর বয়সী গোটা রুরিক ডাইনেস্টিকেই।  তারপর থেকে শুরু হল রুশ ইতিহাসের অমানিশা । ইতিহাসবিদরা যাকে লাল কালিতে লিখে গেছেন Times of Troubles।  এই অল্প কয় বছরের ভিতর রাশানরা কি না দেখেছে?

ক্ষমতার গদি নিয়ে রাজ সভার কামড়া কামড়ি। টানা কয়েক বছর ধরে চলা দুর্ভিক্ষ। না খেতে পেয়ে গ্রামের পর গ্রাম উজার। কৃষক বিদ্রোহ, লবন বিদ্রোহ । একের পর এক ভুয়া দিমিত্রি।  প্রতিবেশী রাজ্য গুলো যার যেমন খুশি মত রাশিয়ার একেক এলাকা দখল করে নিয়ে যাচ্ছে। যেন পুরো মগের মুল্লুক!  আর এখন তো পুরো দেশটাই চির শত্রু পোলিশদের দখলে।

Image result for moscow surrounded by poles images

 

এই দুর্দিনে পুরো রাশিয়া যখন হতাশার অন্ধকারে ঢাকা তখন আলোর মশাল জ্বলে উঠল ভল্গা পাড়ের এক শহরে। বনিকদের শহর। ভলগা নদীর সব চেয়ে বড় trade route । সেই শহরের এক কসাই কুজমা মিনিন আর বিখ্যাত সেনা নায়ক ও রুরিক প্রিন্স দিমিত্রি পাজারস্কি মিলে ছক কষতে লাগলেন পোলিশ বধের। পর দিন নিঝনি ক্রেমলিনের নিচে গিয়ে কুজমা মিনিন সারা শহরকে একত্র করে ডাক দিলেন বিপ্লবের। তৈরি হয়ে গেল National Militia এর বিশাল এক বাহিনী। আর শহরের যে যা পারল তাই এনে জড় করতে লাগল ক্রেমলিনের সামনে। তৈরি হয়ে গেল বিশাল এক ফান্ড। এই অবিস্বরনীয় ঘটনাকে স্বরন করে ১৮৯৬ সালে  Konstantin mokovsky আকলেন রাশিয়ার সব চেয়ে বড় চিত্রকর্ম। যা এখনো এখানের আর্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।

 

যাইহোক, সেই বাহিনী মস্কো পৌঁছে পুরো Red Square ঘিরে ফেলল। যেই পোলিশ বাহিনীকে সুইডিশ রা হারাতে পারে নি, মাত্র ৪ দিনের যুদ্ধে তাদের পরাজিত করে রাশিয়াকে এনে দিল স্বাধীনতা। সেই সাথে যবনিকা টানল সেই কুখ্যাত times of Troubles এর। সেই স্মৃতিকে ধরে রাখতে Red Square এ অবস্থিত Saint Basil Cathedral এর সামনে নির্মাণ করা হল স্বাধীনতার দুই নায়ক মিনিন ও পাজারস্কির ভাস্কর্য ।

Monument to Minin and Pozharsky

 

রাশিয়ার দুঃখের দিনে সুখের আলো ছড়িয়ে দেওয়া সেই শহরটির নাম নিঝনি নভগরদ (Нижний Новгород) । রাশিয়ার দুই বৃহত্তম নদী ভলগা আর অকার মোহনায় বেড়ে ওঠা এই শহরটির জন্ম ১২২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ভলগা নদীর সব চেয়ে বড় বানিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় ধিরে ধিরে জনপ্রিয় হতে থাকে শহরটি। অন্য দিকে কাজান হতে তাতার দের আক্রমন থেকে সুরক্ষা পেতে সামরিক দিক দিয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেয়।  তৈরি করা হয় সুদৃশ্য লাল ইটের ক্রেমলিন। যেটা রাশিয়ার অন্যতম পুরাতন এবং শক্তিশালি প্রতিরক্ষা দুর্গ যা কিনা তাতাররা পর পর দুইবার আক্রমন করেও কিছু করতে পারে নি। পুরো শহরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল কিন্তু ক্রেমলিনের ইটটাও সরাতে পারে নি। পরবর্তীতে ইভানের (Ivan the terrible ) এর কাজান জয়ের পিছনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে শহরটি।

তাতার জয়ের পর শহরের সামরিক গুরুত্ব কমতে থাকে , বাড়তে থাকে বানিজ্যিক তাৎপর্য। তৈরি হতে থাকে বনিক কমিউনিটি।  রাশিয়ার প্রথম International Trade Center টাও গড়ে ওঠে এই নিজনিতেই। ১৮১৭ সালে অকা নদীর পাশে শুরু হয়  Makaryev  মেলা যেটা তৎকালীন সময় শুধু রাশিয়া তেই নয় সারা ইউরোপ জুড়েই পরিচিতি লাভ করেছিল। এবং প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে এটা এখনো বিদ্যমান। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নিঝনি নভগরদ রাশিয়ান সম্রাজ্যের বানিজ্যিক রাজধানীতে পরিনত হয়ে উঠে। শহরটা তখন এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে ১৯১৩ সালের এক জরিপে দেখা যায় যে শহরের স্থায়ী অধিবাসীর সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ।

 

কিন্তু সোভিয়েত সময়ে এসে পালটে যায় শহরের চরিত্র। এখানে জন্ম নেওয়া প্রখ্যাত রাশান সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোরকির নামে শহরের নাম পালটে হয়ে যায় Gorky city । গড়ে ওঠে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টরি GAZ  । ২য়  বিশ্বযুদ্ধের সময় আবার শহরটি চলে আসে ত্রাতার ভুমিকায় । সম্মুখ সমরের অধিকাংশ সরঞ্জাম আসত এই নিঝনি থেকেই। এমন কি জার্মানদের ত্রাস খ্যাত t-38 tank এর বড় চালান এখান থেকেই আসত। শহরের গুরুত্ব বুঝে জার্মান রা নিয়মিত ভাবে বিমান হামলা চালাতে থাকে। যার দরুণ অনেক বড় বড় কারখান ধ্বংস হয়ে যায়। এমনকি বিখ্যাত GAZ ও এর শিকার হয়। যুদ্ধের পর আবার নতুন করে গড়ে উঠতে থাকে শহরটি। তবে অ্যামেরিকার সাথে স্নায়ু যুদ্ধ চলা কালিন সময় শহরটি কে পুরো দস্তুর ভাবে Secret city করে ফেলানো হয়। সোভিয়াত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই শহরে বিদেশী  নিষিদ্ধ ছিল । এমনকি সাধারণের কাছে এর ম্যাপ ও বিক্রি করতে দেওয়া হত না। এখানে চলত নানান ধরনের গবেষণা। রাশিয়ার প্রথম কম্পিটারের জন্মটাও এই নিঝনিতে।

সোভিয়াত ভাঙার পর নিঝনি ফিরে আসে তার আগের নামে। আবার ফিরে আসে এর ঐতিহ্য বাহী বানিজ্যিক ভাব ধারায়। তবে সময়ের সাথে বদলে গেছে অনেক কিছুই। নভোসিবিরস্ক আর একাতেরিনবারগের আকস্মিক  উত্থানের পর রাশিয়ার ৩ নম্বর শহর থেকে ৫ নম্বরে নেমে আসে নিঝনি নভগরদ। কিন্তু এখনো রাশিয়ার River Tourism মূল কেন্দ্র শহরটি। এখান থেকে শুধু রাশিয়াতেই নয়, ইউরোপের নানান দেশের জন্য জাহাজ ছাড়ে। তাছাড়া অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রির সাথে সাথে বেড়ে উঠছে IT industry ও। intel , MERA সহ আরো নানান বহুজাতিক কোম্পানির শাখা গড়ে উঠেছে এখানে। তাছাড়া আসন্ন বিশ্বকাপের কোয়াটার ফাইন্যাল এর ২ টি সহ মোট ৬ টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ভলগা আর অকা নদীর মোহনায় নব নির্মিত সুদৃশ্য Stadium এ।

Related image

সবাইকে আমন্ত্রণ রইল শহরটিতে ঘুরে যাবার জন্য।  ক্রেমলিনে দাঁড়িয়ে হয়ত আপনিও  কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে যেতে পারেন সুদূর অতীতে। Bolshoya Pakropskya তে দাঁড়িয়ে হয়ত আপনিও শুনতে পারেন লেলিনের কন্ঠস্বর। Kashirin House এ হয়ত আপনার কানেও আসতে পারে  ম্যাক্সিম গোরকির শৈশবের কোলাহল। অথবা কোন এক বসন্তের বিকেলে ভলগা নদীর পানে তাকিয়ে পুশকিনের মত আপনিও বলে উঠতে পারেন,

 

“Весна, весна, пора любви,
Как тяжко мне твое явленье,
Какое томное волненье
В моей душе, в моей крови…
Как чуждо сердцу наслажденье…
Всё, что ликует и блестит,
Наводит скуку и томленье.

Отдайте мне метель и вьюгу
И зимний долгий мрак ночей…”

 

শান্তিময় পৃথিবীর জন্য, Dobrimir

 

– Shojib Muhmud,

Lobachevsky State University,

Nizhny Novgorod.